ভারতকে দায়ী করে মন্তব্য না করে, ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের দাবি ভারত

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের দাবি জানিয়েছে ভারত। দ্রুত কোনো সিদ্ধান্তে না গিয়ে কিংবা আগেভাগে ভারতকে দায়ী করে মন্তব্য না করে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করতে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন বলে জানিয়েছে নয়াদিল্লি। অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ এবং বিক্ষোভ-পাল্টা বিক্ষোভের উত্তাপের মধ্যেই এ বার্তা জানাতে বাংলাদেশের হাইকমিশনারকে ডেকে পাঠিয়েছে ভারত।

সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস জানায়, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও নয়াদিল্লি একে অপরের কূটনীতিকদের তলব করে প্রতিবাদ জানিয়েছে। একই সময়ে দিল্লিতে বাংলাদেশের দূতাবাস ঘিরে সম্ভাব্য মিছিল ঠেকাতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। মঙ্গলবার সকালে ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে তলব করে ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ সময় পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনের বাইরে ঘটে যাওয়া ‘দুঃখজনক ঘটনা’ এবং শিলিগুড়ির ভিসা সেন্টারে ভাঙচুরের ঘটনায় ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানান।

দিনের শেষ ভাগে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ–মিয়ানমার বিভাগের প্রধান যুগ্ম সচিব বি শ্যাম ঢাকায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহকে ডেকে পাঠান। সেখানে তাকে জানানো হয়, শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত অপরিহার্য।

পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত একাধিক সূত্র জানায়, ভারতকে দায়ী করে আগাম মন্তব্য না করে কারা এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত, তা চিহ্নিত করতে যথাযথ তদন্ত প্রয়োজন—এই অবস্থান স্পষ্ট করা হয়েছে। সূত্রগুলোর মতে, হাদি হত্যাকাণ্ডে ভারতের সম্পৃক্ততার কোনো ভিত্তি নেই। অথচ এ অভিযোগকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে এবং চট্টগ্রামে ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনে প্রবেশের চেষ্টাও চালানো হয়েছে।

সাম্প্রতিক এসব ঘটনার ফলে বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সম্পর্ক ইতোমধ্যেই ইতিহাসের সবচেয়ে নাজুক পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত ১০ দিনের ব্যবধানে দ্বিতীয়বারের মতো ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে ঢাকায় তলব করা হলো। এর আগে প্রতিবাদ জানাতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহকেও দিল্লির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডেকে পাঠানো হয়েছিল।

তবে মঙ্গলবারের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বিবৃতি দেয়নি।

উল্লেখ্য, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণার পরদিন, গত ১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজের পর রাজধানীর বিজয়নগরের বক্স কালভার্ট রোড এলাকায় মোটরসাইকেলে আসা দুই দুর্বৃত্তের গুলিতে গুরুতর আহত হন শরিফ ওসমান হাদি। রিকশায় থাকা অবস্থায় তার মাথায় গুলি লাগে। প্রথমে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য গত ১৫ ডিসেম্বর সরকারি ব্যবস্থাপনায় তাকে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে (এসজিএইচ) তার মৃত্যু হয়। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধি প্রাঙ্গণে তাকে দাফন করা হয়।

হাদির মৃত্যুর ঘটনায় হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে। তিনি আসন্ন নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছিলেন।

প্রসঙ্গত, মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে গেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতা এবং জুলাই মাসের হত্যাযজ্ঞসংক্রান্ত মামলার এজাহারভুক্ত বহু আসামিও ভারতে আশ্রয় নিয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।

সম্প্রতি ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে জড়িতরাও ভারতে পালিয়ে গেছে—এমন দাবি করেছেন অনেকে। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক বর্তমানে চরম নিম্নস্তরে পৌঁছেছে। দুই দেশেই একে অপরের কূটনৈতিক স্থাপনার সামনে বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *