আট দলের আসন সমঝোতায় ধীরগতি, জট কাটছে না দাবি–পাল্টা দাবিতে
শরিকদের সঙ্গে সহজেই আসন সমঝোতা হবে—এমন বক্তব্য আগেই দিলেও বাস্তবে তা এগোচ্ছে না। বিএনপির জোটের মতো টানাপোড়েন নেই বলে দাবি করা হলেও জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলনসহ আট দলের মধ্যে আসন সমঝোতার আলোচনা ধীরগতিতে চলছে।
কোন দল কোন আসনে প্রার্থী দেবে—এ নিয়ে মতবিরোধে আলোচনা আটকে যাচ্ছে। গত ৯ ডিসেম্বর থেকে সোমবার পর্যন্ত তিনটি বিভাগের আসন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রতিবারের মতো এবারও দলগুলো জানিয়েছে, আরও দুই-তিন দিনের মধ্যেই সমাধান হবে। আট দলের একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
৩০০ আসনে একক প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি থাকলেও আট দল নিজেদের আনুষ্ঠানিক জোট হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে না। তারা একে ‘আসন সমঝোতা’ হিসেবে উল্লেখ করছে। জামায়াতের একাধিক নেতা সমকালকে জানিয়েছেন, চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন ১৫০ আসনের তালিকা দিয়েছে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ৫০টি, খেলাফত মজলিস ৩০টি এবং খেলাফত আন্দোলন ২৫টি আসনের তালিকা দিয়েছে। জাগপা ও বিডিপির চাওয়া তুলনামূলক কম। সব মিলিয়ে শরিক দলগুলো জামায়াতের কাছে প্রায় ২৭০টি আসন দাবি করছে। এ ছাড়া আরও কয়েকটি দল আলোচনায় যুক্ত হতে পারে, যাদেরও আসন চাওয়া রয়েছে।
জামায়াতের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা জানান, আসন ছাড়তে তাদের আপত্তি নেই। তবে শরিকরা এমন সব আসন দাবি করছে, যেখানে তাদের সাংগঠনিক অবস্থান জামায়াতের তুলনায় দুর্বল। এসব আসন ছেড়ে দিলে পরাজয় নিশ্চিত হতে পারে। কিছু আসনে শরিক দলের প্রার্থী হতে চান বিএনপি থেকে আসা নেতারা—এ নিয়ে সমস্যা নেই। তবে দুটি আসনে জাতীয় পার্টি থেকে আসা এবং আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন নেতাকে প্রার্থী করার প্রস্তাব জামায়াতের জন্য অস্বস্তিকর বলে জানান তিনি।
চরমোনাইর বড় দাবি
আট দল সূত্রে জানা গেছে, ১৫০ আসনের তালিকা দিলেও চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন অন্তত ১২০টি আসন ছাড় দাবি করছে। দলটি অতীতে কখনো সংসদে প্রতিনিধিত্ব পায়নি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে দলটির প্রাপ্ত ভোট ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ৯৪ শতাংশ।
জামায়াতের এক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, ১৯৯১ সালে ১২ শতাংশ এবং ১৯৯৬ সালে ৮ শতাংশ ভোট পাওয়ার পরও ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি জামায়াতকে ৩০টি আসন ছেড়েছিল। সে সময় সব শরিক মিলিয়ে ৫০ থেকে ৬০টি আসন ছাড়ার চিন্তা ছিল।
চরমোনাই পীর প্রস্তাব দিয়েছেন, ইসলামী আন্দোলন ১২০ আসনে এবং জামায়াত ১৩০ আসনে প্রার্থী দেবে। বাকি ৫০টি আসন অন্য দলগুলোকে দেওয়া হবে। তবে এই প্রস্তাবে জামায়াত রাজি হয়নি। গত অক্টোবরে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার শরিকদের ১০০টি আসন ছাড়ার কথা বললেও এখন দলটি এটিকে অনানুষ্ঠানিক বক্তব্য হিসেবে উল্লেখ করছে।
জামায়াত নেতারা জানান, দলীয় জরিপ অনুযায়ী আগামী নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। শরিক দলগুলোর অবস্থানও জরিপের মাধ্যমে যাচাই করা হয়েছে। এ অবস্থায় অতিরিক্ত আসন ছাড় দিলে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ নষ্ট হবে।
আসন সমঝোতার আলোচনায় ইসলামী আন্দোলনের প্রতিনিধি ও দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য আশরাফ আলী আকন সমকালকে বলেন, বাকি পাঁচটি বিভাগ নিয়ে আলোচনা চলছে। কয়েক দিনের মধ্যেই তা শেষ হবে। কতটি আসন তারা চাইছে—এ প্রশ্নে তিনি বলেন, আলোচনা শেষ হলে বিষয়টি জানানো হবে।
অন্যান্য দলের দাবি পূরণেও জট
খেলাফত মজলিস ৫০টি আসন দাবি করেছে এবং প্রতি জেলায় অন্তত একজন প্রার্থী দিতে চায়। তবে দলটির একাধিক নেতা জানিয়েছেন, তারা ২৫টির কম আসনে রাজি নন। দলটির যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমিন বলেন, যে আসনে যে দলের অবস্থান শক্ত, সে দলই সেখানে প্রার্থী দেবে। ৩০০ আসনে আট দলের একক প্রার্থী থাকবে। দলের আমির মাওলানা মামুনুল হক ঢাকা-১৩ আসনে আট দলের প্রার্থী হবেন।
২০১৮ সালে হবিগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপি জোটের ধানের শীষের প্রার্থী ছিলেন খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আহমেদ আবদুল কাদের। এবার তিনি জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতায় রয়েছেন। শুরুতে তিনি ঢাকা থেকে নির্বাচন করতে আগ্রহী ছিলেন। পরে হবিগঞ্জ-৪ আসনে জামায়াত প্রার্থী পরিবর্তন করে সাংবাদিক ওলিউল্লাহ নোমানকে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর আহমেদ আবদুল কাদেরও ওই আসন থেকেই নির্বাচনে আগ্রহ প্রকাশ করেন। পরে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে নির্বাচন করার ইচ্ছা জানান।
ডামি নির্বাচনখ্যাত ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ নেওয়া খেলাফত আন্দোলনের নেতৃত্ব জুলাই অভ্যুত্থানের পর পরিবর্তন হয়। আওয়ামী লীগ–সমর্থকদের সরিয়ে দলটি জামায়াতের সঙ্গে যুক্ত হয়। জামায়াত নেতারা জানান, যারা আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল, তাদের কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হবে না।
জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের বলেন, জয়ের সম্ভাবনা থাকলে আসন ছাড়তে আপত্তি নেই। আট দলের যে কেউ জয়ী হলে সেটি সবার জয়, আর হারলে সবার পরাজয়। তাই জয়ের সম্ভাবনা নেই—এমন আসন ছাড়লে আট দলই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সাবেক জাপা নেতাদের নিয়ে অস্বস্তি
৫ আগস্টের অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর জাতীয় পার্টির (জাপা) কয়েকজন সাবেক নেতা ইসলামী আন্দোলনে যোগ দেন। তাদের একজন কারি মো. হাবিবুল্লাহ বেলালী। তিনি জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য ছিলেন এবং বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। তিনি ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর জাপায় বিভক্তি দেখা দিলে রওশনের নেতৃত্বাধীন অংশে যোগ দেন এবং ওই বছরের এপ্রিলে প্রেসিডিয়াম সদস্য হন।
৫ আগস্টের পর তিনি ইসলামী আন্দোলনে যোগ দেন। চরমোনাই পীর তাঁকে ময়মনসিংহ-১০ আসনে প্রার্থী করতে চান। তবে অতীত রাজনৈতিক ভূমিকার কারণে তাঁকে নিয়ে জামায়াতের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।
আশরাফ আলী আকন বলেন, বেলালী আগে জাপায় ছিলেন, এখন আর নেই। তবে তিনি ২০২৪ সালের এপ্রিলে রওশনের জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য ছিলেন—এ তথ্য জানা ছিল না বলে তিনি জানান।
এ ছাড়া দশম সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা রওশনের রাজনৈতিক সচিব গোলাম মসিহও ইসলামী আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সাবেক এই জাপা নেতা নারায়ণগঞ্জ থেকে আট দলের প্রার্থী হতে আগ্রহী।
বাংলাদেশ খেলাফতসহ কয়েকটি দলে বিএনপি থেকে আসা নেতাদের মনোনয়নে আপত্তি না থাকলেও সাবেক জাপা ও আওয়ামী লীগ–ঘনিষ্ঠ নেতাদের নিয়ে অস্বস্তি রয়েছে বলে জামায়াত নেতারা জানিয়েছেন।
আট দলের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, সব বিষয়েই আলোচনা চলছে। মনোনয়নপত্র দাখিলের আগেই ৩০০ আসনে একক প্রার্থী চূড়ান্ত করবে আট দল।
