পত্রিকা অফিসে হামলায় ইন্টেলিজেন্স রিপোর্ট ছিল, আমলে নেওয়া হয়নি: সালাহউদ্দিন আহমদ

১৮ ডিসেম্বর রাতে প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকার কার্যালয়ে হামলার প্রসঙ্গ তুলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, “প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে আগুন দেওয়া হয়েছে, পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এই দৃশ্য সারা বিশ্ব দেখেছে। এটি আমাদের জন্য লজ্জার। শুধু দুঃখ প্রকাশ বা ক্ষমা চেয়ে এ ঘটনার সমাপ্তি টানা যাবে না।”

রোববার রাজধানীর হোটেল র‍্যাডিসন ব্লুতে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে দৈনিক পত্রিকা ও অনলাইন নিউজ পোর্টালের সম্পাদক, রেডিও ও টেলিভিশনের বার্তাপ্রধান এবং গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে এ সভার আয়োজন করে বিএনপি।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “এ ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব ছিল সবচেয়ে বেশি। আমরা জেনেছি, হামলার বিষয়ে আগেই গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট ছিল। তাহলে সেটি কেন আমলে নেওয়া হয়নি?”

তিনি আরও বলেন, “শুনেছি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো হলেও এক-দুই ঘণ্টা পর তারা সাড়া দিয়েছে। কেন এমন হলো? কাদের হাতে আমরা রাষ্ট্রব্যবস্থা তুলে দিচ্ছি? নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য যাঁরা দায়িত্ব নিয়েছেন, তাঁদের ভূমিকা আজ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।”

সাম্প্রতিক হামলার প্রসঙ্গে বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, “কিছুদিন ধরে আমরা দেখছি, নির্দিষ্ট করে গণমাধ্যমকে চিহ্নিত করে হামলা চালানো হচ্ছে। এটি নতুন নয়। কিছু স্থাপনা ও ঠিকানায় মবোক্রেসিকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে। আমরা চেয়েছিলাম গণতন্ত্র, কিন্তু কেন তা মবোক্রেসিতে পরিণত হবে? কেন এটিকে লালন করতে দেওয়া হবে? এসবই সরকারের দুর্বলতার দিক নির্দেশ করে। এগুলো আরও কঠোর হাতে দমন করতে হবে।”

দেশের গণপ্রত্যাশা ও গণ-আকাঙ্ক্ষার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “বাংলাদেশের মানুষ পূর্ণ গণতন্ত্র চায়। গণতন্ত্রকে সর্বক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চায়। গণতন্ত্র বিনির্মাণের জন্য যে প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজন, সেগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করতে পারে।”

গণমাধ্যমের ভূমিকা প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “অনেকে গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলে থাকেন। সাংবাদিকদের মধ্যে অনেকের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা থাকতে পারে। তবে বাংলাদেশের স্বার্থের প্রশ্নে আমাদের সবাইকে দেশের পক্ষেই থাকতে হবে। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব যদি জনগণ আমাদের দেয়, তাহলে গণমাধ্যমের সর্বোচ্চ সহযোগিতা আমরা প্রত্যাশা করি। আমরা অতীত ভুলে যেতে চাই, কিন্তু ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠী কী করেছে—তা স্মরণে রাখতে চাই।”

তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “জনগণ আশা করছে, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে। তিনি বাধ্য হয়ে দীর্ঘ ১৮ বছর কষ্টকর নির্বাসিত জীবন যাপন করেছেন। তাঁর এই প্রত্যাবর্তনকে আমরা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার কাজে লাগাতে চাই—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।”

অনুষ্ঠানে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, “শফিক রেহমানের মতো বর্ষীয়ান সাংবাদিককে যেভাবে কারাবন্দি করা হয়েছিল, সেই আচরণ ছিল অত্যন্ত নিন্দনীয়। সব মিলিয়ে ফ্যাসিবাদী শাসনামলে আমরা এক ঘন কালো অন্ধকার সময় পার করেছি। প্রত্যেকেই কমবেশি আক্রান্ত হয়েছি। এখনো যেসব ঘটনা সামনে আসছে, তা আমাদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলছে।”

ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “একজন তরুণ নেতার এমন মৃত্যুর আমরা তীব্র প্রতিবাদ জানাই। কেবল মতপ্রকাশের কারণে কাউকে জীবন দিতে হবে—এটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।”

তিনি আরও বলেন, “কারও বক্তব্য বা মতামতের কারণে তাঁর ওপর হামলা ফ্যাসিবাদ-উত্তর সময়ে কাম্য নয়। ভারতে যেমন ‘গোদি মিডিয়া’র কথা বলা হয়, তেমনি স্বৈরাচারী রাষ্ট্রে গণমাধ্যমকেও একটি নির্দিষ্ট ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়।”

মতবিনিময় সভায় গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন—আজকের পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক কামরুল হাসান, নয়া দিগন্তের সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর, মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান, দৈনিক খবরের কাগজের সম্পাদক মোস্তফা কামাল, কালের কণ্ঠের সম্পাদক হাসান হাফিজ, যুগান্তরের সম্পাদক আব্দুল হাই শিকদার, নির্বাহী সম্পাদক এনাম আবেদীন এবং আমার দেশের নির্বাহী সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমদ।

এ ছাড়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এবং মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক মওদুদ আহমেদ পাভেলও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *