বারে অতিরিক্ত মদ্যপানে অসুস্থ হয়ে পথে মৃত্যু, আন্দোলনে না গিয়েও ‘জুলাই শহীদ’ ঘোষণা!

জুলাই শহীদ হিসেবে সরকারি গেজেটে নাম রয়েছে আল হামীম সায়মনের। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই তার মৃত্যুর পর মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের জুলাই অভ্যুত্থান শাখা প্রকাশিত গেজেটে ৮৪৪ জনের তালিকায় ১০৭ নম্বরে স্থান পায় তার নাম। তবে সম্প্রতি তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন—তিনি কি সত্যিই আন্দোলনে শহীদ হয়েছিলেন, নাকি ভিন্ন কোনো ঘটনায় তার মৃত্যু হয়েছে?

অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশকারী চরচা-এর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য, যা আল হামীম সায়মনের ‘জুলাই শহীদ’ হিসেবে স্বীকৃতি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

আন্দোলনে নয়, ভিন্ন ঘটনায় মৃত্যু—অভিযোগ

অনুসন্ধানে অভিযোগ উঠেছে, আল হামীম সায়মন জুলাই আন্দোলনে নিহত হননি। বরং আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত না থাকা সত্ত্বেও তাকে শহীদের তালিকাভুক্ত করতে প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।

মৃত্যুর পর সায়মনের মরদেহ দাফন করা হয় তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার দাউদকান্দিতে। সরকার ঘোষিত সহায়তা হিসেবে তার পরিবার পায় ৩০ লাখ টাকা। পরে তার হত্যার অভিযোগে একটি মামলাও করা হয়, যেখানে এক থেকে দেড়শ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।

প্রায় দুই বছর বিষয়টি নিয়ে তেমন কোনো বিতর্ক না থাকলেও সম্প্রতি নতুন অভিযোগ সামনে আসার পর অনুসন্ধানে নেমে ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে।

১৮ জুলাই কী ঘটেছিল

২০২৪ সালের ১৮ জুলাই কোটাবিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক সংঘর্ষ চলছিল। ওই দিন বিকেল ৩টার দিকে সবুজবাগ থানার ৭৩ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণগাঁও এলাকার বাসা থেকে একটি ফোনকল পেয়ে বের হন আল হামীম সায়মন। এরপর পরিবারের সঙ্গে তার আর যোগাযোগ হয়নি।

রাত সাড়ে ১০টার দিকে পরিবার জানতে পারে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এর জরুরি বিভাগে তার মরদেহ রাখা হয়েছে। পরদিন ভোরে জানাজা শেষে তাকে দাউদকান্দিতে দাফন করা হয়।

এর কিছুদিন পরই তাকে ‘জুলাই শহীদ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং পরিবারকে ৩০ লাখ টাকার আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।

রাজনৈতিক পরিচয় ও স্থানীয়দের বক্তব্য

স্থানীয় বাসিন্দা ও বন্ধুদের ভাষ্য অনুযায়ী, সায়মন কখনোই জুলাই আন্দোলনে অংশ নেননি। বরং তিনি ছিলেন জুলাই আন্দোলনের বিরোধী এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত।

তিনি সবুজবাগ থানার ৭৩ নম্বর ওয়ার্ডে শেখ রাসেল জাতীয় শিশু-কিশোর পরিষদের এডহক কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এবং ২০২৪ সালে সংগঠনটির চূড়ান্ত কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন। এ সংক্রান্ত দাপ্তরিক নথিও সংগ্রহ করেছে চরচা।

স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানান, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সায়মন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলনবিরোধী পোস্ট দিতেন। তার মৃত্যুর পর পরিবারের সদস্যরা তার ফেসবুক আইডি থেকে আওয়ামী লীগ-সম্পর্কিত পোস্টগুলো মুছে ফেলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

ময়নাতদন্ত হয়নি, সনদে অস্পষ্টতা

১৮ জুলাই রাত ১০টা ২০ মিনিটে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক সায়মনকে মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যু সনদে লেখা হয়—
“Brought in dead. Cause of death will be ascertained after post mortem. H/O physical assault.”

অর্থাৎ, ময়নাতদন্ত ছাড়া মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলে উল্লেখ করা হলেও পরে স্বজনদের আবেদনে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ হস্তান্তর করা হয়।

সবুজবাগ থানার এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, সায়মনের বাবা লিখিতভাবে দাবি করেন যে তার ছেলের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এ নিয়ে কোনো অভিযোগ করবেন না—এই মর্মে প্রত্যয়ন দেওয়ার পর মরদেহ ছাড় করা হয়।

অতিরিক্ত মদ্যপানের অভিযোগ

অনুসন্ধানে আরও উঠে আসে, ১৮ জুলাই বিকেলে সায়মন কাকরাইলের একটি বারে যান এবং সেখানে অতিরিক্ত মদ্যপানের পর অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তার অবস্থার অবনতি ঘটে।

সায়মনের সঙ্গে থাকা ব্যক্তি নিজেই চরচাকে জানান, পুলিশের ভয়ে তিনি হাসপাতালে মদ্যপানের বিষয়টি গোপন করেছিলেন।

স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, এই তথ্য গোপন রাখতেই দ্রুত ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফনের ব্যবস্থা করা হয়।

মামলা ও তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন

সায়মনের মৃত্যুর প্রায় এক বছর পর ২০২৫ সালের ৩০ জুন তার বাবা রামপুরা থানা-য় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলায় অভিযোগ করা হয়, আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা তাকে পিটিয়ে হত্যা করেছে।

তবে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, মৃত্যুর সময় উপস্থিত ব্যক্তিদের বক্তব্যে মদ্যপানে অসুস্থ হয়ে মৃত্যুর বিষয়টি উঠে এসেছে। তদন্ত এখনও চলমান।

এদিকে, দাউদকান্দি উপজেলার ইউএনও জানিয়েছেন, মরদেহ উত্তোলন বা ময়নাতদন্তের জন্য এখনো কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

পুলিশের অতিরিক্ত আইজি খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন,
“জুলাই-সংক্রান্ত প্রতারণার এমন অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। প্রমাণ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের জুলাই অভ্যুত্থান শাখার উপসচিব জানান, এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসকেরা জানান, দীর্ঘ সময় পার হলেও মরদেহ উত্তোলন করে ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া এখনও সম্ভব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *