লখনউ বিশ্ববিদ্যালয়ে মুসলিম ছাত্রদের নিরাপত্তা দিতে মানবঢাল হয়ে দাঁড়াল হিন্দু সহপাঠীরা

বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম শিক্ষার্থীরা নামাজ আদায় করছেন, আর তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মানববন্ধন করে চারপাশে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছেন হিন্দু শিক্ষার্থীরা—এমন এক ব্যতিক্রমী দৃশ্য সম্প্রতি ভারতের লখনউ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দেখা গেছে। উত্তরপ্রদেশের স্থানীয় গণমাধ্যম ছাড়িয়ে এই দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়েছে।

জানা গেছে, ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে অবস্থিত প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক লাল বড়দারি মসজিদ কমপ্লেক্সকে ঘিরে। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মসজিদটির গেটে তালা লাগিয়ে তা বন্ধ করে দেয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে এবং যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে—এ কারণেই মসজিদটি বন্ধ রাখা হয়েছে।

তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, রমজান মাসে মুসলিম শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা বা পূর্ব নোটিশ ছাড়াই প্রশাসন একতরফাভাবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে রমজানের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তারা মসজিদে প্রবেশ করে নামাজ আদায় করতে পারেননি।

এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা ধারাবাহিকভাবে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে আসছেন। তাদের দাবি, ২০০ বছরেরও বেশি পুরোনো ভবনের ভেতরে অবস্থিত মসজিদটি কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের পরিপন্থী।

এরই ধারাবাহিকতায় রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের বাইরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেন। বিক্ষোভ চলাকালেই মুসলিম শিক্ষার্থীরা মসজিদের বাইরে নামাজ আদায় শুরু করেন। এ সময় পুলিশ উপস্থিত থাকায় নামাজে বাধা সৃষ্টি হতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে হিন্দু শিক্ষার্থীরা তাদের মুসলিম সহপাঠীদের ঘিরে মানবঢাল তৈরি করে দাঁড়িয়ে যান। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এই দৃশ্য মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের অবস্থানে অনড় রয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, লাল বড়দারি কমপ্লেক্সটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এবং যেকোনো সময় ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে সেখানে অবস্থিত ব্যাংক, ক্লাব ও ক্যান্টিনসহ অন্যান্য স্থাপনাও খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গেটে তালা লাগানোর পাশাপাশি ব্যারিকেডও স্থাপন করা হয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র বলছে, বড়দারির ভেতরে কিছু কার্যক্রম চালু রয়েছে, যদিও সেগুলোর প্রকৃতি সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।

এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা কংগ্রেসের রাজ্যসভার সাংসদ ইমরান প্রতাপগড়ী–এর সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলেন। তিনি শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সমর্থন জানান। কংগ্রেসের সংখ্যালঘু বিষয়ক বিভাগের চেয়ারম্যান ইমরান প্রতাপগড়ী সোমবার ইনস্টাগ্রামে বিষয়টি নিয়ে একটি পোস্ট দেন।

পোস্টে তিনি লেখেন,
“লখনউ বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত শতাব্দীপ্রাচীন লাল বড়দারি মসজিদে শিক্ষার্থীরা নামাজ আদায় করে আসছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক দশকের ঐতিহ্যের অংশ। কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়াই মসজিদের দরজা ঝালাই করে সিল করে দেওয়া হয়েছে। রমজানের মতো পবিত্র মাসে এ ধরনের সিদ্ধান্ত কী বার্তা দেয়? গত রাতে আমি প্রতিবাদী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলেছি এবং তাদের দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছি। লখনউ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত অবিলম্বে লাল বড়দারি এলাকা শিক্ষার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে ঘৃণার পরীক্ষাগারে পরিণত করা উচিত নয়।”

উল্লেখ্য, লাল বড়দারি কমপ্লেক্সটি লখনউ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের মধ্যেই অবস্থিত। প্রায় ২০০ বছর আগে, ১৮০০ সালে নবাব নাসিরুদ্দিন হায়দার এই ঐতিহাসিক ভবনটি নির্মাণ করেন। বর্তমানে এটি ভারতের ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (এএসআই)–এর সংরক্ষিত ঐতিহাসিক স্থাপনার তালিকাভুক্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *