আমার দুঃসময়ে বিএনপির সহযোগিতা ছিল শতভাগ: মো. সাহাবুদ্দিন

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তাকে অপসারণের উদ্দেশ্যে একাধিক ‘চক্রান্ত’ হয়েছিল বলে দাবি করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তিনি বলেছেন, দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা চিরতরে ধ্বংস করা এবং সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টির লক্ষ্যে নানা পাঁয়তারা চালানো হয়েছিল। তবে তিনি দৃঢ়চিত্তে নিজের সিদ্ধান্তে অবিচল থাকায় কোনো ষড়যন্ত্রই সফল হয়নি।

দৈনিক কালের কণ্ঠ-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন।

অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর বঙ্গভবনে কেমন কেটেছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “ওই দেড় বছর আমি কোনো আলোচনায় ছিলাম না, অথচ আমাকে ঘিরে চলেছে নানামুখী চক্রান্ত। দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা ধ্বংস ও সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরির অনেক চেষ্টা হয়েছে।”

তিনি বলেন, “আমি দৃঢ়চিত্তে আমার সিদ্ধান্তে অবিচল ছিলাম। সে কারণেই কোনো ষড়যন্ত্র সফল হয়নি। বঙ্গভবনে কাটানো দেড় বছরের অভিজ্ঞতাকে ভালো বলা যাবে না। আমার ওপর দিয়ে যে ঝড় বয়ে গেছে, তা সহ্য করার মতো মানসিক শক্তি অন্য কারও ছিল কি না, আমি জানি না।”

রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের কিছু নেতার চাপে তাকে অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা হয় এবং এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারও একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, রাজনৈতিক দলগুলো যদি তার অপসারণ চায়, তাহলেই কেবল তা সম্ভব—অন্যথায় নয়। পরে এ ইস্যুতে রাজনৈতিক অঙ্গনে দুটি স্পষ্ট গ্রুপ তৈরি হয়।

দুঃসময়ে কারা তার পাশে ছিলেন—এমন প্রশ্নের জবাবে মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, “আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি, সেই কঠিন সময়েও বিএনপি-র শীর্ষ নেতৃত্ব আমার পাশে ছিলেন। তারা সংবিধানের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখার বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছিলেন।”

তিনি বলেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান-কে ঘিরে তার মনে শুরুতে কৌতূহল ছিল। “পর্যায়ক্রমে বুঝেছি, তিনি অত্যন্ত আন্তরিক মানুষ। হি ওয়াজ সো কর্ডিয়াল। আমার দুঃসময়ে বিএনপির সহযোগিতা শতভাগ ছিল।”

রাষ্ট্রপতির ভাষ্য অনুযায়ী, বিএনপির উচ্চপর্যায়ের নেতারা তাকে আশ্বস্ত করে বলেন, অসাংবিধানিক উপায়ে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের পক্ষে তারা নন এবং সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চান।

তিনি আরও বলেন, “বিএনপি ও তাদের জোটসঙ্গীরা একত্রে একটি অবস্থান নেয়। অপরদিকে আরেকটি গ্রুপ তৈরি হয়, যাদের সবাই চেনেন। শেষ পর্যন্ত তারা ব্যর্থ হয়। বিএনপি ও তাদের জোটের অবস্থানের কারণেই এই উদ্যোগ ব্যর্থ হয় এবং একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক দলের এই অবস্থানকে সরকার সমর্থন করতে বাধ্য হয়।”

রাষ্ট্রপতির অভিযোগ, রাজনৈতিক পর্যায়ে উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকেই নতুন করে তাকে অপসারণের চেষ্টা করা হয়। “একজন সাবেক প্রধান বিচারপতিকে এনে আমার স্থলে বসানোর চক্রান্ত করা হয়েছিল। সরকারের এক উপদেষ্টা ওই বিচারপতির সঙ্গে ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকও করেন। তবে তিনি রাজি হননি।”

তিন বাহিনীর সমর্থনের কথাও উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, বিভিন্ন সময়ে তারা তার কাছে এসে মনোবল জুগিয়েছেন। এমনকি বঙ্গভবনের সামনে মব সৃষ্টি হলে সশস্ত্র বাহিনী অবস্থান নেয় বলেও জানান তিনি।

বিদেশ সফরে যেতে না দেওয়ার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার চায়নি কোথাও আমার নাম বা পরিচিতি উঠে আসুক। আমাকে একরকম অন্ধকারে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। শুধু বিদেশ সফর নয়, দেশের ভেতরেও কোনো অনুষ্ঠানে যেতে দেওয়া হয়নি। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে রাষ্ট্রপতির যাওয়ার যে রেওয়াজ রয়েছে, সেটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়।”

রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, “এক রাতের মধ্যে বিশ্বের সব হাইকমিশন থেকে আমার ছবি নামিয়ে ফেলা হয়। দীর্ঘদিনের রেওয়াজ হঠাৎ করে শেষ করে দেওয়া হয়েছিল। বিষয়টি গণমাধ্যমে আসার পরই আমি জানতে পারি। তখন মনে হয়েছিল, এটি হয়তো আমাকে অপসারণের প্রথম ধাপ।”

তিনি অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রপতির প্রেস উইং প্রত্যাহার করে নেয় এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবসগুলোতে রাষ্ট্রীয় ক্রোড়পত্রে রাষ্ট্রপতির ছবি ও বাণী প্রকাশও বন্ধ করে দেয়—যার উদ্দেশ্য ছিল জনগণের কাছ থেকে তার উপস্থিতি ও পরিচিতি মুছে দেওয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *