লেখাঃ আরিফ রহমান, লেখক ও গবেষক
দীপু চন্দ্র দাসকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে হত্যা করে তাঁর লাশ পোড়ানোর ঘটনা আপনারা নিশ্চয়ই শুনেছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে লাশ পোড়ানো যেন এক ধরনের নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে—এটা আমরা এতদিনে বুঝে গেছি।
কিন্তু আমি একটু দৃষ্টি ফেরাতে চাই আফগানিস্তানের এমনই একটি ঘটনার দিকে এবং সেই ঘটনায় রাষ্ট্রের ভূমিকার দিকে। এই ঘটনাটি সামনে এনে প্রশ্ন রাখতে চাই—বাংলাদেশের পরিস্থিতি কি এখন আফগানিস্তানের চেয়েও খারাপ হয়ে গেছে?
২০১৫ সালের ১৯ মার্চ। আফগানিস্তানের কাবুলের আকাশ সেদিন অন্য যেকোনো দিনের মতোই পরিষ্কার ছিল। বসন্তের আগমনে শহরজুড়ে চলছিল নওরোজ উদ্যাপনের প্রস্তুতি। কিন্তু এই উৎসবমুখর পরিবেশের মাঝেই কাবুলের শাহ-দো শামশিরা মসজিদের সামনে ঘটে যায় এক পৈশাচিক ঘটনা, যা কেবল আফগানিস্তান নয়—পুরো বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দেয়।
২৭ বছর বয়সী ফারখুন্দা মালিকজাদা ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ মুসলিম নারী। তিনি সদ্য ইসলামিক স্টাডিজে স্নাতক সম্পন্ন করেছিলেন এবং শিগগিরই ধর্মতত্ত্বের শিক্ষিকা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করার স্বপ্ন দেখছিলেন। অথচ ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে, ধর্মের দোহাই দিয়েই তাঁকে পৃথিবীর সবচেয়ে নিষ্ঠুর উপায়ে হত্যা করা হয়।
ফারখুন্দা নিয়মিত নামাজ আদায় করতেন এবং পবিত্র কোরআনের হাফেজ হওয়ার পথে ছিলেন। ঘটনার দিন তিনি শাহ-দো শামশিরা মসজিদের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন। সেখানে তিনি লক্ষ্য করেন, জয়নুদ্দিন নামের এক খাদেম বা মোল্লা অসহায় নারীদের সরলতার সুযোগ নিয়ে তাবিজ-কবজ বিক্রি করছে। নিঃসন্তান নারী কিংবা পারিবারিক সমস্যায় জর্জরিত মানুষদের ধর্মীয় ভীতি দেখিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়াই ছিল ওই মোল্লার মূল কাজ।
ফারখুন্দা এই কুসংস্কার ও শোষণের বিরুদ্ধে চুপ থাকতে পারেননি। তিনি জয়নুদ্দিনকে চ্যালেঞ্জ করে বলেন,
“এসব তাবিজ-কবজ ইসলামসম্মত নয়। আপনি কেন মানুষের ঈমান নিয়ে ব্যবসা করছেন?”
একজন নারীর মুখে এমন সত্য কথা এবং নিজের ব্যবসা ক্ষতির আশঙ্কায় মোল্লা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে সে সঙ্গে সঙ্গে মিথ্যা অভিযোগ তোলে—
“এই নারী কোরআন পুড়িয়েছে! সে আমেরিকার চর! ধরো তাকে!”
এই চিৎকারে মুহূর্তের মধ্যে শত শত মানুষ সেখানে জড়ো হয়। কেউ যাচাই করার প্রয়োজন বোধ করেনি। ফারখুন্দা বারবার চিৎকার করে বলছিলেন,
“আমি মুসলিম। আমি কোরআন পোড়াইনি। আমি নির্দোষ।”
কিন্তু ধর্মান্ধ ও উন্মত্ত জনতা তাঁর আর্তনাদ শোনেনি।
শুরু হয় নির্মম নির্যাতন। প্রথমে চড়-থাপ্পড়, পরে লাথি ও ঘুষি। ভিড় বাড়তে থাকে। জনতা তাঁকে ঘিরে ধরে। পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও তারা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। একপর্যায়ে জনতা ফারখুন্দাকে ছাদ থেকে নিচে ফেলে দেয়। এরপর পাথর ও কাঠের তক্তা দিয়ে মারধর শুরু হয়।
রক্তাক্ত ফারখুন্দা যখন নড়াচড়ার শক্তি হারান, তখনও জনতার আক্রোশ থামে না। তাঁর শরীরের ওপর দিয়ে একটি গাড়ি চালিয়ে দেওয়া হয়। এরপর তাঁর নিথর দেহ রশি দিয়ে বেঁধে প্রায় ২০০ মিটার টেনেহিঁচড়ে কাবুল নদীর তীরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
আগুনের লেলিহান শিখায় যখন তাঁর দেহ পুড়ছিল, তখনও চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা জনতা ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি দিচ্ছিল।
সবচেয়ে জঘন্য বিষয় হলো—এই পুরো ঘটনাটি হত্যাকারীরা নিজেদের মোবাইল ফোনে ভিডিও করছিল এবং গর্বের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছিল। তাদের চোখে তারা ছিল ‘ধর্মের রক্ষক’।
ঘটনার পর আফগান সরকার তদন্ত শুরু করে। তদন্তে বেরিয়ে আসে নির্মম সত্য—ফারখুন্দা সম্পূর্ণ নির্দোষ ছিলেন।
ঘটনাস্থলে পোড়ানো কোনো কোরআনের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। বরং কিছু পোড়া কাগজ পাওয়া যায়, যা ছিল ফারখুন্দার নিজের নোটবুক। যে নারী আজীবন ধর্মের শুদ্ধতা চর্চা করেছেন, তাকেই ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অপবাদে প্রাণ দিতে হলো।
ফারখুন্দার জানাজার দিন কাবুলে এক অভাবনীয় দৃশ্য দেখা যায়। আফগান ঐতিহ্যে নারীদের জানাজায় অংশ নেওয়া বা কফিন বহন করা নিষিদ্ধ। কিন্তু ফারখুন্দার নির্মম মৃত্যু আফগান নারীদের ক্ষোভের বাঁধ ভেঙে দেয়। পুরুষের পরিবর্তে নারীরাই তাঁর কফিন কাঁধে তুলে নেন। চোখের জলে ভাসতে ভাসতে তাঁকে কবরস্থানে নিয়ে যান।
পরবর্তীতে ৪৯ জন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। মূল উসকানিদাতা মোল্লা জয়নুদ্দিন ও তাঁর সহযোগীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। যদিও পরবর্তী সরকারগুলো সেই সাজা কমিয়েছে, তবু দোষীরা এখনো সাজা ভোগ করছে।
দায়িত্বে অবহেলার জন্য ১১ জন পুলিশ সদস্যকেও শাস্তি দেওয়া হয়। তবে অনেক মানবাধিকারকর্মীর মতে, প্রকৃত বিচার এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি।
কাবুলের সেই নদীর তীরে আজ একটি স্মৃতিস্তম্ভ দাঁড়িয়ে আছে—যা মনে করিয়ে দেয়, ফারখুন্দা মৃত্যুর পরও প্রমাণ করে গেছেন, অজ্ঞতার অন্ধকার কতটা ভয়ংকর হতে পারে।
আমার ভাই দীপু চন্দ্র দাস কি অন্তত ফারখুন্দা আফগানিস্তানে যে পরিমাণ বিচার পেয়েছিলেন, সেইটুকু বিচার পাবেন?
ইতিহাস কি বলে—তিনি পাবেন?
